Author: Admin

  • গণতন্ত্রের শক্ত খুঁটিঃ সাংবাদিকতা ও নিউজ মিডিয়ার আসল গুরুত্ব

    গণতন্ত্রের শক্ত খুঁটিঃ সাংবাদিকতা ও নিউজ মিডিয়ার আসল গুরুত্ব

    সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে এক কাপ চা আর হাতে খবরের কাগজ—কিংবা এখনকার দিনে মোবাইল স্ক্রিনে একটু চোখ বোলানো। আমরা প্রতিদিন সকালে আসলে কী খুঁজি? আমরা জানতে চাই, আমাদের চারপাশে কী ঘটছে, দেশে কী হচ্ছে, আর দুনিয়াটাই বা কোন দিকে যাচ্ছে। এই যে আমাদের মনে জানার ইচ্ছা, এই ইচ্ছাকে যে জিনিসটা পূরণ করে, সেটাই হলো সংবাদ মাধ্যম বা মিডিয়া।

    সহজ কথায় বলতে গেলে, একটা দেশ যদি একটা বড় পরিবার হয়, তবে মিডিয়া হলো সেই পরিবারের চোখ আর কান। কিন্তু এই চোখ আর কান তখনই ঠিকঠাক কাজ করবে, যখন এর পেছনে থাকবে সততা আর নীতি। একেই বড় বড় মানুষেরা বলেন ‘নৈতিক সাংবাদিকতা’। আজ আমরা কোনো কঠিন বা জটিল তাত্ত্বিক কথা না বলে, একবারে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায় বুঝব—কেন এই নীতিবান সাংবাদিকতা আমাদের সমাজের জন্য এত জরুরি এবং এটি কীভাবে আমাদের অধিকার রক্ষা করে।

    নীতিবান সাংবাদিকতা আসলে কী?

    অনেকে মনে করেন, খবরের কাগজে যা ছাপা হয় বা টিভিতে যা দেখানো হয়, সবই সাংবাদিকতা। কিন্তু সব খবর কি সত্যি হয়? সব খবর কি মানুষের উপকারে আসে? না, আসে না।

    নীতিবান সাংবাদিকতা হলো সেই কাজ, যা কোনো লোভ, ভয় বা নিজের লাভের কথা চিন্তা না করে মানুষের সামনে শুধু ‘সত্যি’ ঘটনাটা তুলে ধরে। এর মূল কথাগুলো খুবই সহজ:

    • যা দেখেছি তা-ই বলা: নিজের মন থেকে বানিয়ে বা রঙ চড়িয়ে কোনো কথা না বলা।
    • কারো পক্ষ না নেওয়া: ধনী-দরিদ্র, চেনা-অজানা সবার ক্ষেত্রে একই নিয়ম মানা এবং ঘটনার সব পক্ষের কথা সমানভাবে শোনা।
    • ভুল হলে মেনে নেওয়া: মানুষ মাত্রই ভুল হতে পারে। কোনো খবরে ভুল হলে তা লুকিয়ে না রেখে বুক ফুলিয়ে স্বীকার করা এবং তা শুধরে নেওয়া।

    আমেরিকার বিখ্যাত সাংবাদিক ওয়াল্টার ক্রনকাইট একবার বলেছিলেন:

    “আমাদের সমাজ বা শাসনব্যবস্থাকে যদি ঠিকঠাক টিকিয়ে রাখতে হয়, তবে সাংবাদিকতা হলো তার আসল জ্বালানি। এই জ্বালানি ছাড়া সমাজ এগোতে পারে না।”

    খবরের কাগজ বা মিডিয়া কেন সমাজের শক্ত খুঁটি?

    একটা ঘর যেমন কয়েকটা খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, আমাদের সমাজ বা দেশটাও তেমনি কিছু নিয়মের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় খুঁটি হলো সংবাদ মাধ্যম। কেন একে এত বড় মর্যাদা দেওয়া হয়? আসুন সহজ কয়েকটি পয়েন্টে জেনে নিই:

    ১. ক্ষমতার অপব্যবহার রুখে দেওয়া

    যারা সমাজের উঁচুতলায় থাকেন বা ক্ষমতায় বসেন, তাদের হাতে অনেক শক্তি থাকে। সাধারণ মানুষ অনেক সময় তাদের সামনে গিয়ে কথা বলার সাহস পায় না। সংবাদ মাধ্যমের কাজ হলো সেই শক্তিশালী মানুষদের কাজের ওপর নজর রাখা। তারা কোনো ভুল করছেন কি না, জনগণের টাকা নয়ছয় করছেন কি না—তা সাধারণ মানুষের সামনে আনা।

    আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন মিডিয়ার গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে একটি ঐতিহাসিক কথা বলেছিলেন:

    “আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, আমরা কি কোনো সরকার ছাড়া খবরের কাগজ চাই, নাকি খবরের কাগজ ছাড়া সরকার চাই? আমি এক সেকেন্ডও সময় না নিয়ে বলব, আমি সরকার ছাড়া খবরের কাগজই বেছে নেব।”

    জেফারসন সাহেব এই কথা কেন বলেছিলেন? কারণ তিনি জানতেন, সরকার না থাকলেও সমাজ হয়তো কোনোমতে চলবে, কিন্তু দেশের মিডিয়া যদি মরে যায়, তবে মানুষের স্বাধীনতা বলে আর কিছু থাকবে না।

    সমাজের ক্ষমতার ভারসাম্য
    আইন ও বিচার ব্যবস্থাসংবাদ মাধ্যম (মিডিয়া)
    আইন তৈরি করে এবং অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করে।সাধারণ মানুষের কথা তুলে ধরে এবং অন্যায়ের খোঁজ দেয়।

    ২. গরিব ও অসহায় মানুষের মুখ হওয়া

    সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন যারা দিন এনে দিন খান। তাদের ঘরবাড়ি ভেঙে গেলে, জমি দখল হয়ে গেলে বা তারা কোনো বিপদে পড়লে তাদের কথা শোনার কেউ থাকে না। একজন সৎ সাংবাদিক যখন সেই প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে তাদের কষ্টের কথা ডায়েরিতে লেখেন এবং তা খবরের কাগজে প্রকাশ করেন, তখন পুরো দেশ তা জানতে পারে। প্রশাসন তখন বাধ্য হয় সেই মানুষের পাশে দাঁড়াতে।

    নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তাঁর একটি গবেষণায় দারুণ এক তথ্য দেখিয়েছেন:

    “পৃথিবীর ইতিহাসে যেসব দেশে স্বাধীন এবং মুক্ত খবরের কাগজ বা মিডিয়া রয়েছে, সেখানে কখনো কোনো বড় আকারের দুর্ভিক্ষ বা না খেয়ে মানুষ মরার মতো ঘটনা ঘটেনি।”

    এর কারণ কী জানেন? কারণ হলো, দেশের কোথাও কোনো সমস্যা বা খাদ্যের অভাব দেখা দিলেই সাংবাদিকরা তা আগেভাগেই সবাইকে জানিয়ে দেন। ফলে সরকার বাধ্য হয় দ্রুত সেখানে খাবার পাঠাতে। খবর চাপা থাকলে মানুষ না খেয়ে মারা যেত, যা আমরা অতীতে অনেকবার দেখেছি।

    ভালো বনাম সস্তা সাংবাদিকতায় মূল তফাত কোথায়?

    আজকাল ইন্টারনেটের যুগে খবরের অভাব নেই। ফেসবুকে ঢুকলেই হাজারটা খবর চোখের সামনে ভাসে। কিন্তু সব খবর তো আর খবর নয়, অনেক সময় তা মনের ভুল বা ছড়ানো গুজবও হয়। আমরা কীভাবে চিনব কোনটা ভালো সাংবাদিকতা আর কোনটা সস্তা বা ভুয়া কাজ?

    নিচের সাধারণ ছকটি দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে:

    ভালো ও নীতিবান সাংবাদিকতাসস্তা ও ভুয়া সাংবাদিকতা
    খবরের সত্যতা ভালোভাবে যাচাই করে তারপর প্রকাশ করে।শুধু অন্য জায়গা থেকে শুনে বা কপি-পেস্ট করে খবর ছড়িয়ে দেয়।
    ঘটনার সাথে জড়িত সব পক্ষের বক্তব্য সমানভাবে তুলে ধরে।নিজের লাভ বা পছন্দের মানুষের পক্ষে একতরফা কথা বলে।
    এমন খবর লেখে যা সমাজের উপকারে আসে, মানুষের চোখ খোলে।শুধু মানুষের মনে রাগ, ক্ষোভ বা সস্তা উত্তেজনা তৈরি করে।
    শিরোনাম বা টাইটেল দেখলেই বোঝা যায় ভেতরে কী খবর আছে।চটকদার বা মিথ্যা শিরোনাম দিয়ে মানুষকে ধোঁকা দেয় (ক্লিকবাইট)।

    বিখ্যাত লেখক ও সাংবাদিক জর্জ অরওয়েল সাংবাদিকতার আসল রূপ নিয়ে একটি অমোঘ কথা বলে গেছেন:

    “সাংবাদিকতা হলো এমন কিছু একটা প্রকাশ করা যা অন্য কেউ একজন লুকিয়ে রাখতে চায়। বাকি যা কিছু আছে, তার সবটুকুই হলো বিজ্ঞাপন।”

    তার মানে, কেউ যখন তার অপরাধ বা দুর্নীতি লুকাতে চায়, আর সাংবাদিক যখন নিজের জীবন বাজি রেখে তা সাধারণ মানুষের সামনে এনে হাজির করেন, সেটাই হলো আসল সাংবাদিকতা। আর বাকি যা কিছু শুধু কারো প্রশংসা করার জন্য লেখা হয়, তা আসলে খবরের নামে এক ধরণের বিজ্ঞাপন।

    বর্তমান যুগের বড় আপদ হলো ভুয়া খবর আর লাইক-ভিউয়ের ইঁদুর দৌড়

    আজকে আমরা এক অদ্ভুত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আগে মানুষ খবর পড়ার জন্য পয়সা দিয়ে কাগজ কিনত। আর এখন খবর আমাদের মোবাইল স্ক্রিনে ফ্রিতে চলে আসে। এই ‘ফ্রি’ পাওয়ার চক্করেই একটা বড় বিপদ তৈরি হয়েছে। একে বলা হয় লাইক আর ভিউয়ের ইঁদুর দৌড়।

    অনলাইনের অনেক পোর্টাল বা পেজ চিন্তা করে—কত বেশি মানুষ তাদের লিঙ্কে ক্লিক করল। কারণ যত বেশি ক্লিক পড়বে, তত বেশি বিজ্ঞাপনের টাকা আসবে। এই টাকার লোভে পড়ে অনেকেই খবরের মূল সত্যতা হারিয়ে ফেলেন।

    • আজগুবি শিরোনাম: “ভিডিওটি দেখলে আপনার চোখ কপালে উঠবে!” কিংবা “অমুক নেতা এ কী করলেন!”—ভেতরে গিয়ে দেখা যায় কিছুই নেই, পুরোই ফাঁকা।
    • গুজব ছড়ানো: কোনো একটা ঘটনা সত্যি নাকি মিথ্যা, তা একটুও খোঁজ না নিয়ে শুধু সবার আগে শেয়ার করার চক্করে তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে অনেক সময় সমাজে মারামারি বা দাঙ্গা পর্যন্ত লেগে যায়।

    কৃষ্ণাঙ্গ আন্দোলনের নেতা ম্যালকম এক্স এই বিষয়ে সাধারণ মানুষকে একটা মস্ত বড় হুঁশিয়ারি দিয়ে গিয়েছিলেন:

    “মিডিয়া হলো পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী জিনিস। এদের ক্ষমতা এত বেশি যে এরা একজন অপরাধীকে নির্দোষ আর একজন নির্দোষ ভালো মানুষকে অপরাধী বানিয়ে দিতে পারে।”

    তাই আমরা চোখ বুজে যা দেখব তা-ই বিশ্বাস করলে চলবে না। আমাদের নিজেদেরও একটু সচেতন হতে হবে।

    সমাধান কোথায় এবং সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের কী করার আছে?

    আমরা অনেকেই ভাবি, “আমি তো সাধারণ মানুষ, আমি একা এই এত বড় মিডিয়া জগতকে কীভাবে বদলাব?” কিন্তু সত্যি বলতে, মিডিয়ার আসল চাবিকাঠি কিন্তু আপনার-আমার মতো সাধারণ মানুষের হাতেই রয়েছে। আমরা যা দেখব, মিডিয়া তা-ই দেখাবে। আমরা যদি সস্তা জিনিস পছন্দ করি, তবে তারা সস্তা জিনিসই বানাবে।

    তাই আমাদের প্রতিদিনের জীবনে এই তিনটি ছোট নিয়ম মেনে চলা উচিত:

    ১. যাচাই না করে শেয়ার নয়: ফেসবুকে বা অন্য কোথাও কোনো খবর দেখলেই হুট করে বিশ্বাস করবেন না বা লাইক-শেয়ার করবেন না। আগে একটু চিন্তা করুন, খবরটি কোন পেজ বা আইডি থেকে এসেছে? তারা কি নির্ভরযোগ্য?

    ২. ভালো কাজের কদর করা: যে সাংবাদিক বা যে খবরের কাগজটি সৎভাবে কঠিন সত্য তুলে ধরছে, তাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত। প্রয়োজনে তাদের খবরগুলো বেশি করে পড়া এবং অন্যদের পড়তে বলা।

    ৩. চটকদার খবর এড়িয়ে চলা: যেসব পেজ শুধু মানুষের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সস্তা চটকদার খবর বানায়, তাদের এড়িয়ে চলুন। তাদের পেজে ক্লিক করা বন্ধ করে দিলে তারা এমনিতেই সঠিক পথে ফিরতে বাধ্য হবে।

    বিখ্যাত নাট্যকার টম স্টপার্ড একটি চমৎকার কথা বলেছিলেন:

    “আপনার উদ্দেশ্য যদি হয় এই পৃথিবীকে একটুখানি বদলে দেওয়া, তবে সাংবাদিকতা হলো সবচেয়ে দ্রুত কাজ করার মতো একটা অস্ত্র।”

    শেষ কথা

    একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ তৈরি করতে হলে যেমন ভালো শিক্ষকের প্রয়োজন, ভালো চিকিৎসকের প্রয়োজন, ঠিক তেমনি একজন সৎ ও সাহসী সাংবাদিকের প্রয়োজন। নীতিবান সাংবাদিকতা ছাড়া সাধারণ মানুষের অধিকার কখনো টিকে থাকতে পারে না।

    যেদিন দেশের প্রতিটি সাংবাদিক কোনো ভয় বা লোভের কাছে মাথা নত না করে সাধারণ মানুষের কথা লিখবেন, আর দেশের নাগরিকরা সচেতন হয়ে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করতে শিখবেন—সেদিনই আমাদের সমাজ সত্যিকারের একটি শান্তির জায়গায় পরিণত হবে। কারণ দিনের শেষে, সত্যের জয় অনিবার্য, আর সেই সত্যকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার নামই হলো প্রকৃত সাংবাদিকতা।

  • কোরবানির সস্তা চামড়া যেভাবে কোটি টাকার বিলাসবহুল ব্র্যান্ডে রূপ নেয়

    কোরবানির সস্তা চামড়া যেভাবে কোটি টাকার বিলাসবহুল ব্র্যান্ডে রূপ নেয়

    আমরা প্রতিদিন কতশত চামড়ার জিনিস ব্যবহার করি—পায়ের জুতো, হাতের ব্যাগ, শীতের জ্যাকেট কিংবা শখের গাড়ির দামি সিট কাভার। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, এই চকচকে ও মসৃণ পণ্যগুলোর পেছনের আসল গল্পটা ঠিক কেমন?

    গোটা পৃথিবীতে প্রতিদিন লাখ লাখ টন মাংস উৎপাদিত হচ্ছে। আর এই বিশাল মিট প্রোডাকশন ফ্যাক্টরিগুলো থেকে প্রতিদিন উপজাত বা বাই-প্রোডাক্ট হিসেবে বেরিয়ে আসছে হাজার হাজার কিলোমিটার পশুর চামড়া। বিশ্বজুড়ে এই চামড়া প্রসেস করার এক বিশাল শিল্প গড়ে উঠেছে। বিশেষ করে আমাদের দেশে কোরবানির ঈদের সময় যে চামড়াগুলো পানির দামে বিক্রি হয়ে যায়, সেগুলোই কিন্তু পরবর্তীতে বিভিন্ন দেশের নামী-দামী ফ্যাক্টরি ঘুরে আমাদের কাছেই ফিরে আসে লাখ টাকার ব্র্যান্ডেড পণ্য হয়ে। আজকের এই আর্টিকেলে আমরা অত্যন্ত সহজ ভাষায় জানবো, কীভাবে একটা নোংরা, রক্তাক্ত কাঁচা চামড়া ধাপে ধাপে প্রক্রিয়াজাত হয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি লাক্সারি পণ্যে রূপান্তরিত হয়।

    কাঁচামাল সংগ্রহ ও কোরবানির বাজারের ভেতরের খেলা

    লেদার বা চামড়া শিল্পের প্রথম ধাপটাই হলো কাঁচামাল বা পশুর কাঁচা চামড়া (Raw Hide) সংগ্রহ করা। বছরের সাধারণ দিনগুলোতে বিভিন্ন কসাইখানা বা মিট প্রসেসিং প্ল্যান্ট থেকে নিয়মিত চামড়া সংগ্রহ করা হলেও, এই ব্যবসার আসল মৌসুম হলো কোরবানির ঈদ।

    বছরের অন্য দিনগুলোতে যে চামড়ার বাজারমূল্য থাকে ২,০০০ থেকে ৪,০০০ টাকা, কোরবানির দিন সেই চামড়াটাই মাত্র ৫০০ বা তার চেয়েও কম টাকায় বিক্রি হয়ে যায়। এর মূল কারণ হলো একসঙ্গে প্রচুর চামড়ার জোগান। বাজারে যখন হঠাৎ করে লাখ লাখ চামড়া চলে আসে, তখন চামড়া ব্যবসায়ীরা এই সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করেন। তারা দেশের দূর-দূরান্ত থেকে অত্যন্ত সস্তায় এই চামড়াগুলো কিনে নেন। এরপর পাইকারি ব্যবসায়ী এবং বড় বড় লেদার কোম্পানিগুলো এই চামড়াগুলোকে ট্রাকের পর ট্রাক বোঝাই করে ফ্যাক্টরি বা ট্যানারিতে নিয়ে আসে। এখান থেকেই শুরু হয় চামড়ার আসল রূপান্তরের ম্যাজিক।

    ট্যানারির প্রাথমিক ধাপ হলো সোর্টিং এবং ওয়াশিং প্রসেস

    ফ্যাক্টরিতে চামড়া আসার পর কিন্তু সরাসরি মেশিনে দেওয়া যায় না। কাঁচা চামড়া দ্রুত পচে যায়, তাই একে টিকিয়ে রাখার জন্য এবং পরবর্তী ধাপের উপযোগী করার জন্য বেশ কিছু প্রাথমিক কাজ করতে হয়।

    ১. লবণ মাখানো ও সংরক্ষণ (Salting)

    চামড়া ফ্যাক্টরিতে আসার সাথে সাথেই তাতে প্রচুর পরিমাণে লবণ মাখিয়ে বেশ কিছু সময় বা দিন রেখে দেওয়া হয়। লবণ চামড়ার ভেতরের অতিরিক্ত পানি শুষে নেয় এবং ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ থেকে রক্ষা করে। এর ফলে চামড়া নরম হয় এবং দীর্ঘদিনেও পচে না।

    ২. গ্রেডিং বা ক্যাটাগরি বিভাজন (Sorting)

    সব চামড়া এক কোয়ালিটির হয় না। কোনো পশুর চামড়া মোটা হয়, কোনোটির পাতলা। আবার অনেক চামড়ায় ক্ষত বা দাগ থাকে। তাই দক্ষ শ্রমিকরা চামড়ার গুণগত মান, আকার এবং থিকনেস দেখে এগুলোকে আলাদা আলাদা ক্যাটাগরিতে ভাগ করেন। কোন চামড়া দিয়ে জুতো হবে, আর কোনটা দিয়ে জ্যাকেট বা ব্যাগ তৈরি হবে—তা এই ধাপেই ঠিক করা হয়।

    ৩. স্টেইনলেস স্টিলের ব্যারেলে ওয়াশিং (Washing & Soaking)

    এবার চামড়াগুলোকে ক্রেনের সাহায্যে তুলে বিশাল বিশাল স্টেইনলেস স্টিল বা কাঠের তৈরি রোটেটিং ব্যারেলের (Rotating Barrel) ভেতর ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। এই ব্যারেলগুলো অবিরাম ঘুরতে থাকে। ব্যারেলের ভেতর পানি এবং বিশেষ রাসায়নিকের মিশ্রণ থাকে, যা চামড়ার গায়ে লেগে থাকা অতিরিক্ত লবণ, রক্ত, ময়লা এবং পশুর গায়ের পশম পুরোপুরি পরিষ্কার করে দেয়। এই প্রসেসটি কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত চলে।

    ফ্লেশিং এবং ট্রিমিন হলো মাংস ও চর্বি আলাদা করার পদ্ধতি

    ব্যারেল থেকে ধুয়ে বের করার পর চামড়াগুলোকে পাঠানো হয় ‘ফ্লেশিং’ (Fleshing) সেকশনে। কাঁচা চামড়ার ভেতরের দিকে প্রচুর চর্বি, মাংসের টুকরো এবং এক ধরণের আঠালো জেলাটিন লেগে থাকে। এগুলো পরিষ্কার না করলে চামড়া দিয়ে কোনো পণ্য তৈরি করা সম্ভব নয়।

    • ফ্লেশিং মেশিনের কাজ: চামড়াগুলোকে একটি রোটেটিং রাবার ব্লেডযুক্ত মেশিনের ভেতর দিয়ে পাস করানো হয়। এই মেশিনটি চামড়ার ক্ষতি না করে ভেতরের সব চর্বি ও মাংস স্ক্র্যাপ করে আলাদা করে ফেলে।
    • বাই-প্রোডাক্ট বা জেলাটিন সংগ্রহ: ফ্লেশিং প্রক্রিয়ায় চামড়া থেকে যে চর্বি এবং জেলাটিন বের হয়, তা কিন্তু ফেলে দেওয়া হয় না। এগুলো সংগ্রহ করে বিভিন্ন ফার্মাসিউটিক্যালস বা ওষুধ কোম্পানিতে পাঠানো হয় ক্যাপসুলের খোসা বা অন্যান্য মেডিকেল প্রোডাক্ট তৈরির জন্য।
    • সাইড ট্রিমিং: ফ্লেশিং শেষ হওয়ার পর একজন দক্ষ অপারেটর বা ওয়ার্কার কনভেয়র বেল্টের ওপর চামড়াটি রেখে এর চারপাশের অপ্রয়োজনীয় বা আঁকাবাঁকা অংশগুলো কেটে বাদ দিয়ে দেন। এই বাদ পড়া অংশগুলোও জেলাটিন প্রোডাকশনে ব্যবহৃত হয়।

    ট্যানিং প্রসেস মানে পচনশীল চামড়াকে স্থায়ী রূপ দেওয়া

    ফ্লেশিং ও ট্রিমিন শেষ হওয়ার পর চামড়া আবার চলে যায় ব্যারেলে। এবার শুরু হয় চামড়া শিল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, যাকে বলা হয় ট্যানিং (Tanning)। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মূলত একটি পচনশীল জৈব চামড়া চিরস্থায়ী এবং অপচনশীল লেদারে পরিণত হয়।

    চামড়াগুলোকে আবার ব্যারেলে ভরে তার মধ্যে মিনারেল সল্ট (যেমন ক্রোমিয়াম সালফেট) এবং বেশ কিছু স্পেশাল কেমিক্যাল মেশানো হয়। এরপর এই ব্যারেল একটানা প্রায় ২৪ ঘণ্টা ঘোরানো হয়। কেমিক্যালগুলো চামড়ার ভেতরের কোলাজেন ফাইবারের সাথে বিক্রিয়া করে চামড়াকে শক্ত ও দীর্ঘস্থায়ী করে তোলে। এই কেমিক্যাল রিঅ্যাকশনের পর চামড়াগুলোর রঙ হালকা নীলচে হয়ে যায়, যাকে লেদার ইন্ডাস্ট্রির ভাষায় ‘ওয়েট ব্লু’ (Wet Blue) বলা হয়।

    পানি নিষ্কাশন, থিকনেস পরিমাপ ও স্লিটিং করা

    ট্যানিং ব্যারেল থেকে বের করার পর ওয়েট ব্লু চামড়াগুলো পানিতে একদম ভেজা থাকে। তাই এগুলোকে পরবর্তী কাজের উপযোগী করতে পানি শুকানো এবং নির্দিষ্ট পুরুত্বে আনা প্রয়োজন।

    ওয়েল্ডিং বা রিংগিং (Wringing)

    প্রথমে চামড়াগুলোকে একটি ওয়েল্ডিং বা রিংগিং মেশিনের ভারী রোলারের ভেতর দিয়ে পাঠানো হয়। এই মেশিনটি চামড়ার ওপর তীব্র চাপ প্রয়োগ করে ভেতরের সমস্ত বাড়তি পানি চিপে বের করে দেয়।

    হিটিং ও রোলিং (Heating & Rolling)

    পানি বের করার পর চামড়াগুলোকে একটি হিটিং রোলিং মেশিনের ভেতর দিয়ে নেওয়া হয়। গরম রোলারের চাপে চামড়ার কুঁচকে থাকা অংশগুলো সোজা হয়ে যায় এবং চামড়া কিছুটা শক্ত ও সমান্তরাল রূপ পায়।

    স্লিটিং প্রসেস (Splitting)

    সব পণ্যের জন্য এক সমান পুরুত্বের চামড়ার প্রয়োজন হয় না। যেমন জ্যাকেটের জন্য পাতলা লেদার লাগে, আবার জুতোর সোলের জন্য মোটা। তাই চামড়ার থিকনেস বা পুরুত্ব মেপে একটি অত্যন্ত নিখুঁত ‘স্প্লিট মেশিনে’ (Splitting Machine) তা ঢোকানো হয়। এই মেশিনটি চামড়াকে মাঝখান থেকে কেটে দুটি স্তরে ভাগ করে দেয়। উপরের ভালো অংশটিকে বলা হয় ‘টপ গ্রেইন লেদার’ এবং নিচের অংশটিকে বলা হয় ‘স্প্লিট লেদার’।

    কালারিং, ড্রাইং এবং ফিনিশিং এর মাধ্যমে লেদারের আসল রূপ প্রদান

    এখনো কিন্তু চামড়া দেখতে আকর্ষণীয় হয়নি। এটিকে জুতো বা ব্যাগের উপযোগী করতে এর ওপর রঙের ছোঁয়া এবং চূড়ান্ত পলিশ দিতে হয়।

    • ডাইং বা কালারিং (Dyeing): চামড়াকে কালো, ব্রাউন বা অন্য যেকোনো রঙ করার জন্য আবার রোটেটিং ব্যারেলে নেওয়া হয়। রঙের সাথে সাথে চামড়াকে নরম ও নমনীয় করার জন্য এখানে বিশেষ ধরণের তেল (যেমন অ্যানিমেল বা ভেজিটেবল অয়েল) ব্যবহার করা হয়। এই প্রসেসটিও প্রায় ২৪ ঘণ্টা চলে।
    • ড্রাইং বা শুকানো (Drying): রঙ করার পর চামড়া শুকানোর জন্য বিভিন্ন মেথড ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো ভ্যাকিউয়াম ড্রাইং বা টগল ড্রাইং। এখানে চামড়াগুলোকে মেটাল ফ্রেমে ক্লিপ দিয়ে টানটান করে আটকে গরম বাতাসের টানেলের ভেতর দিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এতে চামড়ার সারফেস একদম মসৃণ হয়ে শুকিয়ে যায়।
    • কন্ডিশনিং ও কেমিক্যাল স্প্রে: শুকানোর পর চামড়াগুলোকে কয়েকদিন হ্যাঙ্গারে ঝুলিয়ে রাখা হয়। এরপর এর ওপর এক বিশেষ ধরণের প্রতিরক্ষামূলক কেমিক্যাল স্প্রে করা হয়, যাতে লেদারে কোনো বিষাক্ত উপাদান না থাকে এবং এটি ওয়াটারপ্রুফ বা স্ক্র্যাচ-রেজিস্ট্যান্ট হয়।
    • কোয়ালিটি চেক: সবশেষে শ্রমিকরা এই লেদারগুলোকে ইস্ত্রি বা আয়রন করে নেন। এরপর ল্যাবরেটরিতে মেশিনের সাহায্যে এর স্ট্রেচ (টান সহ্য করার ক্ষমতা) এবং ডিউরেবিলিটি বা স্থায়িত্ব পরীক্ষা করা হয়। এই কোয়ালিটি চেকে পাস করলেই চামড়াটি রোল করে প্যাক করা হয় এবং ড্রেস বা শু-মেকিং ফ্যাক্টরিতে পাঠানোর জন্য প্রস্তুত করা হয়।

    ফ্যাক্টরিতে লেদারের জুতো ও অন্যান্য পণ্য তৈরির কারিগরি

    ট্যানারি থেকে নিখুঁত লেদার যখন জুতো বা ব্যাগ তৈরির ফ্যাক্টরিতে আসে, তখন সেখানে চলে আধুনিক প্রযুক্তি এবং মানুষের হাতের কাজের চমৎকার মেলবন্ধন। যদি আমরা একটি জুতোর ফ্যাক্টরির দিকে তাকাই, তবে সেখানে জুতো তৈরির প্রক্রিয়াটি মূলত তিনটি ভাগে বিভক্ত:

    ধাপপ্রক্রিয়াবিবরণ
    ১. কাটিং ও পাঞ্চিংডিজাইন ও কাটিংকম্পিউটারের (CAD) সাহায্যে জুতোর ত্রিমাত্রিক ডিজাইন করা হয়। এরপর লেজার কাটিং মেশিন বা দক্ষ কাটার দিয়ে চামড়া কেটে জুতোর বিভিন্ন অংশ আলাদা করা হয়। যেখানে যেখানে সুতোর সেলাই বা ছিদ্র লাগবে, সেখানে পাঞ্চিং মেশিনে ফুটো করা হয়।
    ২. সোল তৈরিমোল্ডিং প্রসেসজুতোর উপরের অংশ যখন চামড়া দিয়ে তৈরি হচ্ছে, তখন অন্য সেকশনে মোল্ডিং মেশিনের সাহায্যে তরল রাবার বা পিইউ (PU) দিয়ে জুতোর নিচের অংশ অর্থাৎ ‘সোল’ বা তলা তৈরি করা হয়।
    ৩. অ্যাসেম্বলি ও পলিশজোড়া লাগানো ও প্যাকিংজুতোর চামড়ার অংশ (Upper) এবং রাবারের সোলটিকে একসাথে এনে একটি শক্তিশালী হাইড্রোলিক পাঞ্চিং মেশিনের সাহায্যে প্রচণ্ড চাপে আঠা দিয়ে জোড়া লাগানো হয়। সবশেষে কোয়ালিটি ইন্সপেক্টররা নিখুঁতভাবে জুতোটি পরীক্ষা করেন, প্রিমিয়াম লিকুইড দিয়ে পলিশ করেন এবং চমৎকার বক্সে প্যাক করে শোরুমে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন।

    চামড়া শিল্পের অবিশ্বাস্য লাভ ও অর্থনীতির নমুনা হিসাব

    এবার আসা যাক আসল এবং সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয়ে—টাকা বা লাভের হিসাব। আর্টিকেলের শুরুতেই বলেছিলাম, কোরবানির সময় যে পশুর চামড়া মাত্র ৫০০ বা ১,০০০ টাকায় কেনা হচ্ছে, তার শেষ পরিণতি কী?

    হিসাবটা একটু সহজ করে দেখা যাক। একটি বড় সাইজের গরুর চামড়া থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণের পর যে পরিমাণ ভালো কোয়ালিটির লেদার পাওয়া যায়, তা দিয়ে অনায়াসে ৪০ থেকে ৫০ জোড়া প্রিমিয়াম কোয়ালিটির জুতো তৈরি সম্ভব।

    এখন বর্তমান বাজারে যদি একটি পিওর লেদারের জুতোর দাম সর্বনিম্ন ২,০০০ টাকাও ধরা হয় (যদিও ভালো ব্র্যান্ডের জুতোর দাম ৫,০০০ থেকে ১০,০০০ টাকা বা তারও বেশি হয়ে থাকে), তবে ৫০ জোড়া জুতোর বাজারমূল্য দাঁড়ায় প্রায় ১,০০,০০০ (এক লাখ) টাকা!

    [কাঁচা চামড়া: ৫০০ টাকা] 
           ↓ (ট্যানারি প্রসেসিং)
    [তৈরি লেদার] 
           ↓ (ম্যানুফ্যাকচারিং)
    [৪০-৫০ জোড়া জুতো] 
           ↓ (মার্কেট সেল)
    [মোট মূল্য: ১,০০,০০০ + টাকা]
    

    অবশ্যই এর মধ্যে কেমিক্যালের খরচ, ফ্যাক্টরির মেশিনারিজ খরচ, শ্রমিকের মজুরি এবং যাতায়াত ভাড়া রয়েছে। কিন্তু সব খরচ বাদ দিলেও ভ্যালু এডিশন বা মূল্য সংযোজনের হার এতই বেশি যে, একটি চামড়া থেকে কোম্পানিগুলো হাজার গুণ পর্যন্ত মুনাফা বের করে নিতে পারে। জুতো ছাড়াও এই চামড়া দিয়ে যখন নামী-দামী ব্র্যান্ডের (যেমন গুচ্চি, হার্মিস বা লুই ভিটনের মতো লাক্সারি ব্র্যান্ড) মেয়েদের হ্যান্ডব্যাগ বা জ্যাকেট তৈরি করা হয়, তখন একেকটি পণ্যের দাম লাখ টাকা ছাড়িয়ে যায়।

    পরিশেষে বলা যায়, যে কাঁচা চামড়াটা অবহেলায়, অযত্নে রাস্তার পাশে পড়ে থাকে কিংবা কোরবানির হাটে যার কোনো কদর থাকে না—আধুনিক বিজ্ঞান, উন্নত প্রযুক্তি আর শত শত শ্রমিকের দিনরাত পরিশ্রমের ফলে সেটাই হয়ে ওঠে সমাজের উচ্চবিত্ত মানুষের আভিজাত্যের প্রতীক। কাঁচা চামড়া থেকে শুরু করে শোরুমের কাঁচের বাক্সে সাজানো চকচকে জুতো বা ব্যাগ হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ধাপই অত্যন্ত জটিল এবং নিখুঁত পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে যায়।

    চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের এই পুরো প্রক্রিয়াটি এবং এর পেছনের এই বিশাল অর্থনীতির হিসাবটি আপনার কাছে কেমন লাগলো? কাঁচা চামড়ার এই অবিশ্বাস্য রূপান্তরের গল্পটা কি আপনি আগে জানতেন? অবশ্যই আপনার মূল্যবান মতামত নিচে কমেন্ট করে আমাদের জানাবেন। লেখাটি ভালো লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না!

    এ রকম ব্যাবসা-বাণিজ্য অজানা তথ্য জানতে MBangla-এর সাথে থাকুন। জানবেন ও শিখবেন ব্যবসা সম্পর্কে।

  • ইউটিউব দেখে লাখপতি হওয়ার স্বপ্নঃ কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার আগে এই তিতা সত্যগুলো কি আপনি জানেন?

    ইউটিউব দেখে লাখপতি হওয়ার স্বপ্নঃ কৃষি উদ্যোক্তা হওয়ার আগে এই তিতা সত্যগুলো কি আপনি জানেন?

    রাত ১২টা। বিছানায় শুয়ে শুয়ে মোবাইল স্ক্রল করছেন। হঠাৎ সামনে একটা ভিডিও এল—“চাকরি ছেড়ে ড্রাগন ফল চাষ করে মাসে ৪ লাখ টাকা আয় করছেন অমুক ভাই!” কিংবা “মাত্র দুটো গরু দিয়ে শুরু করে আজ তিনি কোটিপতি!” ভিডিওর ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক আর ঝকঝকে এডিটিং দেখে আপনার মনের ভেতর একটা মোচড় দিয়ে উঠল। ভাবলেন, “ধুর! এই চড়া বাজারে গাধার খাটুনি খেটে ১০-২০ হাজার টাকার চাকরি করার কোনো মানে হয়? তার চেয়ে গ্রামে গিয়ে একটা খামার দিলেই তো জীবন বদলে যায়!”

    যদি আপনার মনেও ইদানীং এমন চিন্তা ঘুরপাক খেয়ে থাকে, তবে আজকের এই ব্লগটি আপনার জন্যই। একটু সময় নিয়ে লেখাটি শেষ পর্যন্ত পড়ুন, কারণ চটকদার ওই ভিডিওগুলো আপনার পকেটের জমানো টাকা তো বটেই, আপনার ভবিষ্যৎটাও গিলে খেতে পারে।


    আমরা ইন্টারনেটে যা দেখি, তার সিংহভাগই কিন্তু একটা সাজানো স্ক্রিপ্ট। ফেসবুক বা ইউটিউবের অ্যালগরিদম শুধু সেই ১ জন মানুষের গল্পই আপনার সামনে বারবার আনবে, যে কোনোভাবে সফল হয়েছে। কিন্তু ওই একই ভিডিও দেখে যে বাকি ৯৯ জন তরুণ তাদের বাবার পেনশনের টাকা, জমি বিক্রির পুঁজি বা চড়া সুদের ঋণ নিয়ে মাঠে নেমে আজ নিঃস্ব হয়ে গেছেন—তাদের গল্প কোনো ক্যামেরা দেখায় না।

    কৃষি উদ্যোক্তা হওয়া যদি এতটাই ডালভাত হতো, তবে এই খাত নিয়ে দুনিয়াজুড়ে এত পড়াশোনা বা বৈজ্ঞানিক গবেষণার কোনো প্রয়োজনই থাকত না।


    ক্যামেরার পেছনে লুকিয়ে থাকা ৪টি তিতা সত্য

    ভিডিওতে যা দেখানো হয়, বাস্তব মাঠে নামলে তার উল্টো চিত্র দেখতে পাওয়া যায়। চলুন জেনে নিই আসল সমস্যাগুলো কোথায় হয়-

    ১. খাবার ও ওষুধের আকাশছোঁয়া দাম

    ভিডিওতে হিসাব দেখানো হয়—একটি গরু বা মুরগি দিনে এত টাকার খাবার খায়, আর মাস শেষে এত টাকায় বিক্রি হয়। কিন্তু বাস্তবে বাজারে পশুখাদ্যের দাম প্রতিদিন বাড়ে। এর ওপর আছে নানা রকমের রোগবালাই। খামারের একটা মুরগি বা গরুর অসুখ হলে যে হাজার হাজার টাকার ওষুধ লাগে এবং পুরো খামার ফাঁকা হয়ে যেতে পারে, সেই ভয়ের কথা ভিডিওতে কেউ বলে না।

    ২. বাজার সিন্ডিকেটের নির্মম খেলা

    আপনি হয়তো অনেক কষ্ট করে খুব ভালো মানের ড্রাগন ফল, মাছ বা মুরগি উৎপাদন করলেন। কিন্তু বাজারে নিয়ে যাওয়ার পর বুঝবেন আসল খেলা। সেখানে বসে আছে পাইকারি ব্যবসায়ী আর ফড়িয়াদের বড় সিন্ডিকেট। তারা আপনার পণ্য এমন দামে কিনতে চাইবে, যা দিয়ে আপনার উৎপাদন খরচই উঠবে না। কোল্ড স্টোরেজ বা সঠিক সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়ে কম দামেই আপনাকে পণ্য দিয়ে আসতে হবে।

    ৩. ‘ভিউ’ আর চারা বিক্রির নোংরা ব্যবসা

    অনেকে ইউটিউবে খামারের বড় বড় ভিডিও বানান শুধু দুটো কারণে—এক. ভিডিওতে লাখ লাখ ভিউ এনে ইউটিউব থেকে ডলার ইনকাম করা। দুই. নিজের নার্সারির চারা বা খামারের বাচ্চা চড়া দামে আপনার কাছে বিক্রি করা। আপনার লাভ হলো কি লস হলো, তা নিয়ে ওই কনটেন্ট ক্রিয়েটরের কিচ্ছু আসে যায় না।

    ৪. সব প্রযুক্তি সবার জন্য নয়

    বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষ বা ছাদ বাগান—শুনতে খুব আধুনিক মনে হলেও এগুলো অত্যন্ত জটিল বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। পানির অক্সিজেন লেভেল, পিএইচ (pH) মান কিংবা সুষম সারের সঠিক পরিমাপ না জানলে কয়েকদিনের মধ্যেই প্রজেক্টে ধস নামা নিশ্চিত।


    তাহলে কি কৃষি ব্যবসা করবেন না? অবশ্যই করবেন, তবে এই ৪ নিয়মে-

    কৃষি আমাদের দেশের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত। শিক্ষিত তরুণরা এই খাতে এলে অবশ্যই ভালো কিছু সম্ভব। কিন্তু সেটা হতে হবে আবেগ দিয়ে নয়, বাস্তব বুদ্ধি দিয়ে।

    • ইউটিউব বন্ধ করে আগে সরকারি অফিসে যান: কোনো প্রজেক্ট শুরু করার আগে ইন্টারনেটের ভিডিও না দেখে সরাসরি আপনার উপজেলার কৃষি অফিস, মৎস্য বা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ে যান। সেখান থেকে সরকারি নিয়মে সঠিক ও বাস্তবসম্মত প্রশিক্ষণ নিন।
    • সফলদের পাশাপাশি ব্যর্থদের গল্প শুনুন: আপনার এলাকায় যারা খামার করে লস খেয়েছেন, তাদের কাছে গিয়ে বসেন। জিজ্ঞেস করুন—তারা কোথায় ভুল করেছিলেন। সফল মানুষের চেয়ে ব্যর্থ মানুষের অভিজ্ঞতা আপনাকে বেশি বাঁচিয়ে রাখবে।
    • ছোট পরিসরে শুরু করুন (MVP): শুরুতেই লাখ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে বিশাল প্রজেক্ট ফাঁদবেন না। প্রথমে মাত্র ২-৩টি গরু বা ছোট্ট একটা পুকুর দিয়ে শুরু করুন। নিজের শ্রম দেওয়ার ক্ষমতা এবং বাজারের অবস্থা বোঝেন। অভিজ্ঞতা বাড়লে তারপর বিনিয়োগ বাড়ান।
    • আগে বাজার বুঝুন, পরে উৎপাদন: আপনি যা চাষ করতে যাচ্ছেন, তা আপনার এলাকার বাজারে কেমন দামে বিক্রি হয় এবং কারা কেনে, তা আগে থেকে ঠিক করে রাখুন। বিক্রি করার জায়গা নিশ্চিত না করে এক টাকার জিনিসও উৎপাদন করবেন না।

    মাটি বা জীবন্ত পশুপাখি কোনো ডিজিটাল স্ক্রিন নয় যে ক্লিক করলেই রিফ্রেশ হয়ে যাবে। মাটির নিজস্ব একটা বিজ্ঞান আছে, পশুপালনের নিজস্ব নিয়ম আছে। তাই ইন্টারনেটের চমকপ্রদ আর চাঞ্চল্যকর তথ্য দেখে অতি উৎসাহী হয়ে নিজের জমানো মূলধনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলবেন না।

    ভিডিও দেখে অনুপ্রাণিত হওয়া ভালো, কিন্তু মাঠে নামার আগে পা দুটো যেন বাস্তবতার মাটিতে শক্তভাবে লেগে থাকে। অলীক ফ্যান্টাসি থেকে বের হয়ে এসে কাজটা শিখুন, সময় দিন—সফলতা একদিন আসবেই!