সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে এক কাপ চা আর হাতে খবরের কাগজ—কিংবা এখনকার দিনে মোবাইল স্ক্রিনে একটু চোখ বোলানো। আমরা প্রতিদিন সকালে আসলে কী খুঁজি? আমরা জানতে চাই, আমাদের চারপাশে কী ঘটছে, দেশে কী হচ্ছে, আর দুনিয়াটাই বা কোন দিকে যাচ্ছে। এই যে আমাদের মনে জানার ইচ্ছা, এই ইচ্ছাকে যে জিনিসটা পূরণ করে, সেটাই হলো সংবাদ মাধ্যম বা মিডিয়া।
সহজ কথায় বলতে গেলে, একটা দেশ যদি একটা বড় পরিবার হয়, তবে মিডিয়া হলো সেই পরিবারের চোখ আর কান। কিন্তু এই চোখ আর কান তখনই ঠিকঠাক কাজ করবে, যখন এর পেছনে থাকবে সততা আর নীতি। একেই বড় বড় মানুষেরা বলেন ‘নৈতিক সাংবাদিকতা’। আজ আমরা কোনো কঠিন বা জটিল তাত্ত্বিক কথা না বলে, একবারে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায় বুঝব—কেন এই নীতিবান সাংবাদিকতা আমাদের সমাজের জন্য এত জরুরি এবং এটি কীভাবে আমাদের অধিকার রক্ষা করে।
নীতিবান সাংবাদিকতা আসলে কী?
অনেকে মনে করেন, খবরের কাগজে যা ছাপা হয় বা টিভিতে যা দেখানো হয়, সবই সাংবাদিকতা। কিন্তু সব খবর কি সত্যি হয়? সব খবর কি মানুষের উপকারে আসে? না, আসে না।
নীতিবান সাংবাদিকতা হলো সেই কাজ, যা কোনো লোভ, ভয় বা নিজের লাভের কথা চিন্তা না করে মানুষের সামনে শুধু ‘সত্যি’ ঘটনাটা তুলে ধরে। এর মূল কথাগুলো খুবই সহজ:
- যা দেখেছি তা-ই বলা: নিজের মন থেকে বানিয়ে বা রঙ চড়িয়ে কোনো কথা না বলা।
- কারো পক্ষ না নেওয়া: ধনী-দরিদ্র, চেনা-অজানা সবার ক্ষেত্রে একই নিয়ম মানা এবং ঘটনার সব পক্ষের কথা সমানভাবে শোনা।
- ভুল হলে মেনে নেওয়া: মানুষ মাত্রই ভুল হতে পারে। কোনো খবরে ভুল হলে তা লুকিয়ে না রেখে বুক ফুলিয়ে স্বীকার করা এবং তা শুধরে নেওয়া।
আমেরিকার বিখ্যাত সাংবাদিক ওয়াল্টার ক্রনকাইট একবার বলেছিলেন:
“আমাদের সমাজ বা শাসনব্যবস্থাকে যদি ঠিকঠাক টিকিয়ে রাখতে হয়, তবে সাংবাদিকতা হলো তার আসল জ্বালানি। এই জ্বালানি ছাড়া সমাজ এগোতে পারে না।”
খবরের কাগজ বা মিডিয়া কেন সমাজের শক্ত খুঁটি?
একটা ঘর যেমন কয়েকটা খুঁটির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, আমাদের সমাজ বা দেশটাও তেমনি কিছু নিয়মের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় খুঁটি হলো সংবাদ মাধ্যম। কেন একে এত বড় মর্যাদা দেওয়া হয়? আসুন সহজ কয়েকটি পয়েন্টে জেনে নিই:
১. ক্ষমতার অপব্যবহার রুখে দেওয়া
যারা সমাজের উঁচুতলায় থাকেন বা ক্ষমতায় বসেন, তাদের হাতে অনেক শক্তি থাকে। সাধারণ মানুষ অনেক সময় তাদের সামনে গিয়ে কথা বলার সাহস পায় না। সংবাদ মাধ্যমের কাজ হলো সেই শক্তিশালী মানুষদের কাজের ওপর নজর রাখা। তারা কোনো ভুল করছেন কি না, জনগণের টাকা নয়ছয় করছেন কি না—তা সাধারণ মানুষের সামনে আনা।
আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন মিডিয়ার গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে একটি ঐতিহাসিক কথা বলেছিলেন:
“আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, আমরা কি কোনো সরকার ছাড়া খবরের কাগজ চাই, নাকি খবরের কাগজ ছাড়া সরকার চাই? আমি এক সেকেন্ডও সময় না নিয়ে বলব, আমি সরকার ছাড়া খবরের কাগজই বেছে নেব।”
জেফারসন সাহেব এই কথা কেন বলেছিলেন? কারণ তিনি জানতেন, সরকার না থাকলেও সমাজ হয়তো কোনোমতে চলবে, কিন্তু দেশের মিডিয়া যদি মরে যায়, তবে মানুষের স্বাধীনতা বলে আর কিছু থাকবে না।
| সমাজের ক্ষমতার ভারসাম্য | |
|---|---|
| আইন ও বিচার ব্যবস্থা | সংবাদ মাধ্যম (মিডিয়া) |
| আইন তৈরি করে এবং অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করে। | সাধারণ মানুষের কথা তুলে ধরে এবং অন্যায়ের খোঁজ দেয়। |
২. গরিব ও অসহায় মানুষের মুখ হওয়া
সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন যারা দিন এনে দিন খান। তাদের ঘরবাড়ি ভেঙে গেলে, জমি দখল হয়ে গেলে বা তারা কোনো বিপদে পড়লে তাদের কথা শোনার কেউ থাকে না। একজন সৎ সাংবাদিক যখন সেই প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে তাদের কষ্টের কথা ডায়েরিতে লেখেন এবং তা খবরের কাগজে প্রকাশ করেন, তখন পুরো দেশ তা জানতে পারে। প্রশাসন তখন বাধ্য হয় সেই মানুষের পাশে দাঁড়াতে।
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তাঁর একটি গবেষণায় দারুণ এক তথ্য দেখিয়েছেন:
“পৃথিবীর ইতিহাসে যেসব দেশে স্বাধীন এবং মুক্ত খবরের কাগজ বা মিডিয়া রয়েছে, সেখানে কখনো কোনো বড় আকারের দুর্ভিক্ষ বা না খেয়ে মানুষ মরার মতো ঘটনা ঘটেনি।”
এর কারণ কী জানেন? কারণ হলো, দেশের কোথাও কোনো সমস্যা বা খাদ্যের অভাব দেখা দিলেই সাংবাদিকরা তা আগেভাগেই সবাইকে জানিয়ে দেন। ফলে সরকার বাধ্য হয় দ্রুত সেখানে খাবার পাঠাতে। খবর চাপা থাকলে মানুষ না খেয়ে মারা যেত, যা আমরা অতীতে অনেকবার দেখেছি।
ভালো বনাম সস্তা সাংবাদিকতায় মূল তফাত কোথায়?
আজকাল ইন্টারনেটের যুগে খবরের অভাব নেই। ফেসবুকে ঢুকলেই হাজারটা খবর চোখের সামনে ভাসে। কিন্তু সব খবর তো আর খবর নয়, অনেক সময় তা মনের ভুল বা ছড়ানো গুজবও হয়। আমরা কীভাবে চিনব কোনটা ভালো সাংবাদিকতা আর কোনটা সস্তা বা ভুয়া কাজ?
নিচের সাধারণ ছকটি দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে:
| ভালো ও নীতিবান সাংবাদিকতা | সস্তা ও ভুয়া সাংবাদিকতা |
| খবরের সত্যতা ভালোভাবে যাচাই করে তারপর প্রকাশ করে। | শুধু অন্য জায়গা থেকে শুনে বা কপি-পেস্ট করে খবর ছড়িয়ে দেয়। |
| ঘটনার সাথে জড়িত সব পক্ষের বক্তব্য সমানভাবে তুলে ধরে। | নিজের লাভ বা পছন্দের মানুষের পক্ষে একতরফা কথা বলে। |
| এমন খবর লেখে যা সমাজের উপকারে আসে, মানুষের চোখ খোলে। | শুধু মানুষের মনে রাগ, ক্ষোভ বা সস্তা উত্তেজনা তৈরি করে। |
| শিরোনাম বা টাইটেল দেখলেই বোঝা যায় ভেতরে কী খবর আছে। | চটকদার বা মিথ্যা শিরোনাম দিয়ে মানুষকে ধোঁকা দেয় (ক্লিকবাইট)। |
বিখ্যাত লেখক ও সাংবাদিক জর্জ অরওয়েল সাংবাদিকতার আসল রূপ নিয়ে একটি অমোঘ কথা বলে গেছেন:
“সাংবাদিকতা হলো এমন কিছু একটা প্রকাশ করা যা অন্য কেউ একজন লুকিয়ে রাখতে চায়। বাকি যা কিছু আছে, তার সবটুকুই হলো বিজ্ঞাপন।”
তার মানে, কেউ যখন তার অপরাধ বা দুর্নীতি লুকাতে চায়, আর সাংবাদিক যখন নিজের জীবন বাজি রেখে তা সাধারণ মানুষের সামনে এনে হাজির করেন, সেটাই হলো আসল সাংবাদিকতা। আর বাকি যা কিছু শুধু কারো প্রশংসা করার জন্য লেখা হয়, তা আসলে খবরের নামে এক ধরণের বিজ্ঞাপন।
বর্তমান যুগের বড় আপদ হলো ভুয়া খবর আর লাইক-ভিউয়ের ইঁদুর দৌড়
আজকে আমরা এক অদ্ভুত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আগে মানুষ খবর পড়ার জন্য পয়সা দিয়ে কাগজ কিনত। আর এখন খবর আমাদের মোবাইল স্ক্রিনে ফ্রিতে চলে আসে। এই ‘ফ্রি’ পাওয়ার চক্করেই একটা বড় বিপদ তৈরি হয়েছে। একে বলা হয় লাইক আর ভিউয়ের ইঁদুর দৌড়।
অনলাইনের অনেক পোর্টাল বা পেজ চিন্তা করে—কত বেশি মানুষ তাদের লিঙ্কে ক্লিক করল। কারণ যত বেশি ক্লিক পড়বে, তত বেশি বিজ্ঞাপনের টাকা আসবে। এই টাকার লোভে পড়ে অনেকেই খবরের মূল সত্যতা হারিয়ে ফেলেন।
- আজগুবি শিরোনাম: “ভিডিওটি দেখলে আপনার চোখ কপালে উঠবে!” কিংবা “অমুক নেতা এ কী করলেন!”—ভেতরে গিয়ে দেখা যায় কিছুই নেই, পুরোই ফাঁকা।
- গুজব ছড়ানো: কোনো একটা ঘটনা সত্যি নাকি মিথ্যা, তা একটুও খোঁজ না নিয়ে শুধু সবার আগে শেয়ার করার চক্করে তা ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে অনেক সময় সমাজে মারামারি বা দাঙ্গা পর্যন্ত লেগে যায়।
কৃষ্ণাঙ্গ আন্দোলনের নেতা ম্যালকম এক্স এই বিষয়ে সাধারণ মানুষকে একটা মস্ত বড় হুঁশিয়ারি দিয়ে গিয়েছিলেন:
“মিডিয়া হলো পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী জিনিস। এদের ক্ষমতা এত বেশি যে এরা একজন অপরাধীকে নির্দোষ আর একজন নির্দোষ ভালো মানুষকে অপরাধী বানিয়ে দিতে পারে।”
তাই আমরা চোখ বুজে যা দেখব তা-ই বিশ্বাস করলে চলবে না। আমাদের নিজেদেরও একটু সচেতন হতে হবে।
সমাধান কোথায় এবং সাধারণ মানুষ হিসেবে আমাদের কী করার আছে?
আমরা অনেকেই ভাবি, “আমি তো সাধারণ মানুষ, আমি একা এই এত বড় মিডিয়া জগতকে কীভাবে বদলাব?” কিন্তু সত্যি বলতে, মিডিয়ার আসল চাবিকাঠি কিন্তু আপনার-আমার মতো সাধারণ মানুষের হাতেই রয়েছে। আমরা যা দেখব, মিডিয়া তা-ই দেখাবে। আমরা যদি সস্তা জিনিস পছন্দ করি, তবে তারা সস্তা জিনিসই বানাবে।
তাই আমাদের প্রতিদিনের জীবনে এই তিনটি ছোট নিয়ম মেনে চলা উচিত:
১. যাচাই না করে শেয়ার নয়: ফেসবুকে বা অন্য কোথাও কোনো খবর দেখলেই হুট করে বিশ্বাস করবেন না বা লাইক-শেয়ার করবেন না। আগে একটু চিন্তা করুন, খবরটি কোন পেজ বা আইডি থেকে এসেছে? তারা কি নির্ভরযোগ্য?
২. ভালো কাজের কদর করা: যে সাংবাদিক বা যে খবরের কাগজটি সৎভাবে কঠিন সত্য তুলে ধরছে, তাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত। প্রয়োজনে তাদের খবরগুলো বেশি করে পড়া এবং অন্যদের পড়তে বলা।
৩. চটকদার খবর এড়িয়ে চলা: যেসব পেজ শুধু মানুষের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সস্তা চটকদার খবর বানায়, তাদের এড়িয়ে চলুন। তাদের পেজে ক্লিক করা বন্ধ করে দিলে তারা এমনিতেই সঠিক পথে ফিরতে বাধ্য হবে।
বিখ্যাত নাট্যকার টম স্টপার্ড একটি চমৎকার কথা বলেছিলেন:
“আপনার উদ্দেশ্য যদি হয় এই পৃথিবীকে একটুখানি বদলে দেওয়া, তবে সাংবাদিকতা হলো সবচেয়ে দ্রুত কাজ করার মতো একটা অস্ত্র।”
শেষ কথা
একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজ তৈরি করতে হলে যেমন ভালো শিক্ষকের প্রয়োজন, ভালো চিকিৎসকের প্রয়োজন, ঠিক তেমনি একজন সৎ ও সাহসী সাংবাদিকের প্রয়োজন। নীতিবান সাংবাদিকতা ছাড়া সাধারণ মানুষের অধিকার কখনো টিকে থাকতে পারে না।
যেদিন দেশের প্রতিটি সাংবাদিক কোনো ভয় বা লোভের কাছে মাথা নত না করে সাধারণ মানুষের কথা লিখবেন, আর দেশের নাগরিকরা সচেতন হয়ে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করতে শিখবেন—সেদিনই আমাদের সমাজ সত্যিকারের একটি শান্তির জায়গায় পরিণত হবে। কারণ দিনের শেষে, সত্যের জয় অনিবার্য, আর সেই সত্যকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার নামই হলো প্রকৃত সাংবাদিকতা।

Leave a Reply